শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গেই প্রতি বছরের চেনা ছবি ফের ফিরে এসেছে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে। শুরু হয়েছে তীব্র বায়ুদূষণ। মহা উৎসব দীপাবলি উদযাপনের মাত্র কয়েক দিন আগেই দিল্লির বাতাসের মান আশঙ্কাজনকভাবে খারাপ হতে শুরু করেছে, যা নিয়ে চরম উদ্বেগে পড়েছেন লাখ লাখ বাসিন্দা।
বাতাসে পিএম ২.৫ বা সূক্ষ্ম বস্তুকণার উপস্থিতি মেপে যে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) নির্ধারণ করা হয়, দিল্লিতে তা ইতিমধ্যেই ৩০০-র গণ্ডি পার করে 'খুবই খারাপ' বিভাগে প্রবেশ করেছে। এ ধরনের দূষিত বাতাস দীর্ঘ সময় ধরে শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করলে গুরুতর শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিল শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে শিশু ও প্রবীণরা এই বিষাক্ত ধোঁয়াশার সবচেয়ে বড় শিকার হন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি 'গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যান' (গ্র্যাপ)-এর দ্বিতীয় পর্যায় জারি করেছে। ধূলিকণা ও যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে শহরের রাস্তায় নিবিড় ধোয়ামোছার কাজ শুরু হয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে পার্কিং ফি বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং বাড়ানো হয়েছে গণপরিবহনের সংখ্যা। দিল্লির মেট্রো প্রশাসন কাজের দিনগুলোতে অতিরিক্ত ২০টি ট্রেন ট্রিপ যুক্ত করেছে। পাশাপাশি যানজট কমাতে সরকারি অফিসগুলোর সময়সূচি পুনর্বিন্যাস করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগামী কয়েক দিন বাতাসের মান অত্যন্ত নিম্নপর্যায়ে থাকবে বলে পূর্বাভাস পাওয়ার পরেই এই জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করে প্রশাসন।
প্রতি বছর শীতের মুখে উত্তর ভারতজুড়ে, বিশেষ করে হিন্দু ধর্মীয় উৎসব দীপাবলির সময়, এই মারাত্মক বায়ুদূষণের সংকট তৈরি হয়। আলো, প্রদীপ ও আলোর বাজি বা আতশবাজির মাধ্যমে উৎসবটি উদযাপিত হয়ে থাকে। তবে বাজি পোড়ানোর ফলে যে ক্ষতিকর গ্যাস ও সূক্ষ্ম কণা বাতাসে মেশে, তা পরিস্থিতিকে আরও মারাত্মক করে তোলে। গাড়ির ধোঁয়া, কারখানার নির্গমন, তাপমাত্রা কমে যাওয়া, বাতাসের শ্লথ গতি এবং পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোতে ক্ষেতের খড় বা ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর সম্মিলিত ফলেই প্রতি বছর এই সংকট দেখা দেয়।
অথচ ঠিক এক মাস আগেই দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত অক্টোবর মাসে দিল্লি গত আট বছরের মধ্যে সবচেয়ে পরিষ্কার বাতাস রেকর্ড করেছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাপমাত্রা কমে যাওয়া, বাতাসের গতি ধীর হয়ে আসা এবং পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় ফসলের খড় পোড়ানোর হার হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার কারণেই রাতারাতি বাতাসের মান এমন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। সম্প্রতি একটি সাময়িক ঝড়, বৃষ্টি ও প্রবল বাতাস নিয়ে এসে দিল্লিকে সাময়িকভাবে পরিষ্কার করলেও আবহাওয়া শান্ত হওয়ার সাথে সাথেই উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা বাতাস আবারও খড় পোড়ানোর ধোঁয়া টেনে নিয়ে এসেছে রাজধানীর বুকে।
ভারতের দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, একিউআই ৩০১ থেকে ৪০০-র মধ্যে থাকলে তাকে 'খুবই খারাপ' এবং ৪০০-র উপরে গেলে 'গুরুতর' বা 'ভয়ানক' হিসেবে গণ্য করা হয়। সম্প্রতি বুধবার সকালে দিল্লির একিউআই রেকর্ড করা হয়েছে ৩৭৭। এই সূচকটি মূলত বাতাসে ভাসমান আটটি প্রধান দূষণকারী উপাদান হিসাব করে তৈরি হয়, যার মধ্যে মানব চুল অপেক্ষা ৩০ গুণ ছোট পিএম ২.৫ কণাটি ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে সক্ষম।
গত বছরও সর্বোচ্চ আদালতের বাজি কমানোর নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও দীপাবলির পরদিন সকালে এক বিষাক্ত ধোঁয়াশায় ঢেকে গিয়েছিল দিল্লি। বছরের পর বছর ধরে আতশবাজি তৈরি, বিক্রি ও ব্যবহারের ওপর নানা বিধিনিষেধ ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও তা বাস্তবে প্রয়োগ করা সর্বদাই চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি গত সোমবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট দিল্লির দীপাবলি উইকএন্ডে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার জন্য সার্টিফাইড বা প্রত্যায়িত 'গ্রিন ক্র্যাকার্স' বা সবুজ বাজি তৈরি, বিক্রি ও ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। আদালতের নতুন আদেশ অনুযায়ী, আগামী ৭ ও ৮ নভেম্বর দীপাবলির দিনগুলোতে সকাল ৬টা থেকে ৭টা এবং রাত ৮টা থেকে ১০টার মধ্যেই কেবল নির্ধারিত পরিবেশবান্ধব বাজি ফোটানো যাবে। পাশাপাশি হাসপাতাল, কেয়ার হোম, স্কুল এবং অন্যান্য নির্দিষ্ট 'শব্দহীন এলাকা'র ৩০০ মিটারের মধ্যে সব ধরনের বাজি ফোটানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
পরিবেশবান্ধব এই সবুজ বাজিগুলোতে পরিবর্তিত রাসায়নিক ফর্মুলা ব্যবহার করা হয়, যা সাধারণ বাজির চেয়ে অনেক কম ক্ষতিকর কণা ও গ্যাস নির্গত করে। এগুলো আসল নাকি নকল তা ক্রেতা ও কর্তৃপক্ষ যাতে যাচাই করতে পারেন, সেজন্য বাজির প্যাকেটে কিউআর কোড থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অবশ্য অতীতে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সাধারণ প্রচলিত বাজিকে সবুজ বাজি বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে এবং আদালতও এ বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছে। তাই পুলিশ প্রশাসনকে বাজার ও বিক্রয় কেন্দ্রগুলোতে টহল দেওয়া, দৈবচয়ন ভিত্তিতে কিউআর কোড পরীক্ষা করা এবং অবৈধ বাজি বাজেয়াপ্ত করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে পরিস্থিতি অতিরিক্ত মারাত্মক রূপ নিলে বিগত বছরগুলোর মতো হাইব্রিড স্কুলিং, ঘরে বসে কাজ করার সুব্যবস্থা এবং নির্দিষ্ট কিছু যানবাহনের চলাচলে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে দিল্লি কর্তৃপক্ষ।
বায়ুদূষণের এই প্রাদুর্ভাব শুধু ভারতের রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নেই। উপকূলীয় বাতাসের কারণে সুপরিচিত ও সুফল পাওয়া দেশের আর্থিক রাজধানী মুম্বাইকেও গত এক মাস ধরে অস্বাভাবিক দূষণের সম্মুখীন হতে হয়েছে। গত ২৪ অক্টোবর মুম্বাইয়ের একিউআই বেড়ে ৩২২-এ পৌঁছায়, যা ছিল ‘খুবই খারাপ’ ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত। ধীরগতির বাতাস, নির্মাণের ধূলিকণা, ময়লা-আবর্জনা পোড়ানো, বাজি ও সংলগ্ন অঞ্চলের দূষিত বাতাসের ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে এবং বুধবার মুম্বাইয়ের একিউআই কমে ৮৯-এ নেমে এসছে, যা ‘সন্তোষজনক’ হিসেবে বিবেচিত। পার্শ্ববর্তী নাভি মুম্বাইয়ে একিউআই রেকর্ড হয়েছে ১১৮, যা ‘মাঝারি’ পর্যায়ের।
প্রিন্ট করুন ফটো কার্ড