নিজস্ব প্রতিবেদক: হাজী সাইফুল ইসলাম
গাজীপুর: গাজীপুর জেলার বিভিন্ন সরকারি ও ভূমি সংশ্লিষ্ট অফিসে কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে জনভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। সেবামুখী মানুষকে হয়রানির মাধ্যমে একদিকে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্র হারাচ্ছে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি অফিসে বসে মোটা অঙ্কের অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ এবং জনগণের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে সরকারের অকল্যাণ সাধন করার এক কৌশল অবলম্বন করছে এই চক্রটি।
গাজীপুর এলএ (ভূমি অধিগ্রহণ) শাখায় অধিগ্রহণকৃত জমি ও স্থাপনার ক্ষতিপূরণের বিল তুলতে এসে মারাত্মক হয়রানির শিকার হচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও সাধারণ জমির মালিকরা। অনুসন্ধানে ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগে জানা যায়, সার্ভেয়ার জাহাঙ্গীর ও মুসলেমের নেতৃত্বে একটি মধ্যস্বত্বভোগী দালাল চক্র গড়ে উঠেছে।
দালালদের মারফতে মোট বিলের ৫% থেকে ৩০% পর্যন্ত নগদ ক্যাশ ঘুষ দিলে মাত্র ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বিল পরিশোধের নিশ্চয়তা মেলে। তবে ঘুষ না দিলে ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা তো দূরের কথা, দুই থেকে নয় বছর ঘুরলেও মিলছে না অধিগ্রহণকৃত জমির পাওনা টাকা। ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগ, অডিও ও ভিডিও প্রমাণসহ বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে।
অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও। মেডিকেল সার্টিফিকেট বাণিজ্য, টিকিট বাণিজ্য, রোগীদের নিম্নমানের খাবার পরিবেশন এবং কেবিন ভাড়ার অনিয়মসহ নানা অভিযোগে জিম্মি দর্শনার্থী ও রোগীরা।
হাসপাতালের পরিচালক মো. আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অনিয়ম ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে। কয়েক বছর ধরে বদলির আদেশ থাকলেও তা বাতিল করে বহাল তবিয়তে থাকার অভিযোগ করছেন স্থানীয় আমজনতা। অনিয়মের প্রতিবাদ করলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিচ্যুত বা বদলির হুমকিসহ গুন্ডাবাহিনী দিয়ে ভীতি প্রদর্শনের কথা নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা জানান। এ বিষয়েও অনুসন্ধানী তথ্য-প্রমাণাদি প্রকাশের কাজ চলমান রয়েছে।
অনিয়মের এই ভিড়ে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কাপাসিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নাহিদুল হক। গত এক বছরের দায়িত্বকালে কাপাসিয়া ভূমি অফিসকে দালালমুক্ত ও দুর্নীতিরোধে তাঁর নেওয়া পদক্ষেপ প্রশংসিত হয়।
৩৮তম বিসিএস ব্যাচের এই কর্মকর্তা ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের সন্তান এবং রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (RUET) থেকে আইপিই (IPE) বিষয়ে বিএসসি সম্পন্ন করেন। ২৫ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে কাপাসিয়ায় যোগদানের পর থেকে সততা ও পেশাদারিত্বের সাথে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেন।
সম্প্রতি তাঁর পদোন্নতিজনিত বদলির খবরে কাপাসিয়ার সাধারণ মানুষের মাঝে হতাশার ছাপ দেখা গেছে। কাপাসিয়া বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল মালেক ও স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তফা ফকির, রফিকুল ইসলামরা জানান, নাহিদুল হকের বিদায়ের পর দীর্ঘ ৭-৮ বছর ধরে অফিসে কর্মরত নাজির মাহবুবের নেতৃত্বাধীন দালাল সিন্ডিকেট ফের সক্রিয় হতে পারে। নাজির মাহবুবের স্থানান্তরের জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, "নাহিদুল হক সততার পরিচয় দিয়েছেন। আশা করি, পরবর্তী কর্মকর্তাও ভূমি সেবায় এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন।"
সরকারি সেবা খাতকে গতিশীল রাখা ও রাজস্ব নিশ্চিত করতে ভূমি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অফিসে কঠোর তদারকির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অপপ্রচারে যুক্ত অসাধু কর্মচারীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হলে জনভোগান্তি কমবে এবং সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে।